সাবেকুন নাহার সনির ১৭তম মৃত্যুদিবস

আজ ৮ জুন। সাবেকুন নাহার সনির ১৭তম মৃত্যুদিবস। ২০০২ সালের ৮ জুন বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের (৯৯ ব্যাচ) লেভেল ২, টার্ম ২–এর মেধাবী ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলির মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শোকে, বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায় সমগ্র বাংলাদেশ। এ দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এমন কলঙ্কজনক ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।
এরপর বোন হত্যার বিচারের দাবিতে এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটা ধারাবাহিক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম রচনা করে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। দেশের সচেতন মানুষ এই আন্দোলনে সমর্থন জানান। কিন্তু তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং রাষ্ট্রযন্ত্র এই সন্ত্রাসীদের রক্ষায় নির্লজ্জ ভূমিকা পালন করে। একটা নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা ধারাবাহিক আন্দোলন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দৃঢ়তা, আন্দোলন দমনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আর রাষ্ট্রের নির্মম নির্যাতন আর অপকৌশল সবকিছুই আমাদের কাছে একটা বড় শিক্ষা। কারণ, ‘সনি’ সাধারণ এই একটি নামের মধ্যেই উদ্ভাসিত হয়ে আছে এক বিশাল চেতনা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা।
২০০২ সালের ৮ জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বুয়েট ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ লড়াইয়ের এক ময়দান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠেছিল পরস্পরের অতি আপনজন, সহযোদ্ধা। এই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল সংগ্রামের পথেই প্রকৃত বন্ধুত্ব রচিত হয়। আবার এই আন্দোলনে দেখেছিলাম, একটা নৈতিক আন্দোলন দমনে রাষ্ট্র কত নির্মম হতে পারে! এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পক্ষে সেই দিনগুলো কল্পনা করাও কঠিন।
মনে পড়ে, ২০০২ সালের মিড-টার্মের পরে প্রথম দিনটি ছিল ৮ জুন। চলছে বিশ্বকাপের খেলা। খেলা দেখার জন্য স্বেচ্ছায় ছুটি নিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। বেলা পৌনে একটার দিকে বুয়েটের বিশাল অঙ্কের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে মোকাম্মেল হায়াত খান মুকির নেতৃত্বে ছাত্রদল বুয়েটের একটা সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে গোলাগুলি শুরু হয় ঢাবির এসএম হলের আরেক সন্ত্রাসী টগর গ্রুপের সঙ্গে। অবিরাম গুলিবর্ষণের মধ্যে পড়ে আহসান উল্লাহ হলের সামনে সাবেকুন্নাহার সনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ওই দিন রাতেও খুনিরা অবস্থান করছিল বুয়েটের রশীদ হলে। রাতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করে গিয়ে রশীদ হল ঘেরাও করে ফেলে। প্রশাসনকে জানানো হয় খুনিদের গ্রেপ্তারের জন্য। বেশ কিছুক্ষণ পরে পুলিশসহ প্রশাসন আসে রশীদ হলে। আশ্বস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেখানে মঞ্চস্থ হয় আরেক নাটকের। পুলিশ এসে আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে খুনিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করে। আন্দোলন দমনের কৌশল হিসেবে পরদিন ৯ জুন বুয়েট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই বন্ধের মধ্যেও সারা দেশে আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। খুনিদের বিষয়ে প্রশাসন নমনীয় থাকলেও আন্দোলনকারীদের বিষয়ে বেশ সোচ্চার হয়ে ওঠে তারা। বোনের হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করার অপরাধে (!) বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় স্থাপত্য বিভাগের বিজয় শংকর তালুকদার বিশু, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সহসভাপতি সুব্রত সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বহিষ্কারসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়। প্রশাসন ভেবেছিল, এভাবে শাস্তি দিয়ে ছাত্রদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে হবে, যেন পরে আর আন্দোলন সংগঠিত না হয়।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রতিবাদ ও আন্দোলনের একপর্যায়ে গঠিত হয় ‘সন্ত্রাস বিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্য’। এই ঐক্যে যুক্ত হয়েছিল সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবস্থানকারী ছাত্রছাত্রীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীবৃন্দ। জাতীয়ভাবেও এই আন্দোলন সফল করতে সব বামপন্থী ছাত্রসংগঠন মিলে গঠিত হয় ‘প্রগতিশীল ছাত্র জোট’। ৬৩ দিন বন্ধ থেকে বুয়েট খোলার পরে শুরু হয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, সমাবেশ, ছাত্র ধর্মঘট, পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা, ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে আন্দোলন না করার জন্য শিক্ষকদের হুমকি, কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনের বিরোধিতা, আন্দোলনকারীদের হতাশা-দৃঢ়তা—কী ছিল না এই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে। এই আন্দোলনেরও বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। এখানে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ না থাকলেও ভবিষ্যতে আমাদেরই কাউকে না কাউকে দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, ইতিহাস বিকৃতির ইতিহাস আমাদের অজানা নয়।
এ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো এখন ব্যঙ্গ করে বলবে, ‘…কী লাভ হলো এই আন্দোলন করে? শুধু শুধু কয়েকটা মাস সেশনজট ছাড়া।…’ কথাটা বললাম এ জন্য যে তখনো আমাদের এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। উত্তরটা না হয় প্রত্যেকেই আমরা নিজেদের মতো ভাবতে থাকি…।
তবে এই ক্রমাগত আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সনি হত্যাকাণ্ড মামলার দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা হয় এবং মামলার রায়ে সন্ত্রাসী মুকি, টগরসহ তিনজনের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। এই মামলার রায় ছিল বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের প্রথম বিচার। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সাকা চৌধুরীর নিকটাত্মীয় মুকিত পালিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। টগরসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করলে উচ্চ আদালত ফাঁসির রায় কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন। ধারাবাহিক এই আন্দোলন না থাকলে বিএনপি সরকারের সময়ে দ্রুত বিচারে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে বিচার হওয়াটা ছিল অলীক কল্পনা। এই বিচারটুকু অর্জিত হয়েছিল সবার ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে।
একটা কথা আমাদের সব সময়ই মনে রাখতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত করে বা আপস করে হয়তো বড় ডিগ্রি অর্জন করা যায়, কিন্তু কখনোই মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা যায় না। আমরা সন্ত্রাসবিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্যের সহযোদ্ধারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত করিনি। পুলিশ-সন্ত্রাসীদের নির্যাতন-নিপীড়ন, দালাল শিক্ষকদের রক্তচক্ষু, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি ভোগ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে সেশনজট তৈরি করা ইত্যাদি সবকিছুই ছাপিয়ে গেছে এই ৩-৪ মাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে হাতে হাত রেখে লড়াই করার শিক্ষা, মানুষ হওয়ার শিক্ষা। আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুখময় স্মৃতি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ লড়াইয়ের স্মৃতি।
সন্ত্রাস বিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্যের পক্ষে
ইমরান হাবিব রুমন (পুরকৌশল বিভাগ, ৯৮ ব্যাচ, বুয়েট)
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও বিজ্ঞান আন্দোলন মঞ্চের কেন্দ্রীয় সভাপতি
[২০১৯ সালের ৮ই জুন প্রথম আলোতে প্রকাশিত]

Leave a Comment